Responsive HTML5 Website Template for Developers | 3rd Wave Media

পরিবেশবান্ধব সবুজ সার

কোন কোন বিশেষ ফসল চাষ করে তা নির্দিষ্ট বয়সে ভূমি উন্নয়নকল্পে চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে তাকে সবুজ সার বলা হয়। যে কোন সবুজ গাছকে কোমল অবস্থায় মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া, মাটির গুণাবলী উন্নয়নের জন্য একটি উত্তম কাজ বলে প্রাচীনকাল থেকেই স্বীকৃত হয়ে আসছে। মিশিয়ে দেয়ার পর মাটিতে অবস্থানরত অনুজীবের কার্যাবলীতে বিয়োজন ঘটে এবং এগুলো জৈব সারে পরিণত হয়। গাছের সবুজ পাতা, কচি শাখা-প্রশাখা সংগ্রহ ও জমিতে প্রয়োগ করে যে সার উৎপাদন করা হয় তাকে সবুজ পাতা সার বলে। জমির আশপাশ, পতিত জমি ও জঙ্গল থেকে পাতা ও শাখা সংগ্রহ করা যায়। জমিতে চাষ দিয়ে মিশিয়ে দেয়ার পর তার পচন প্রকৃতি ও পচন হারের উপর সবুজ সারের কার্যকরিতা নির্ভর করে। জমিতে মিশিয়ে দেয়ার পর সবুজ দ্রব্য পর্যায়ে কয়েকটি জৈব রাসায়নিক সার বিক্রিয়া সংঘটিত হয়। এসব বিক্রিয়ার পর সার থেকে খাদ্যোপাদান ধীরে ধীরে উদ্ভিদের জন্য প্রাপ্য হয়ে ওঠে। এজন্য অন্যান্য আয়তনী জৈব সারের চেয়ে সবুজ সারের কার্যকারিতা কিছুটা ধীরে বা বিলম্বিত হয়। সবুজ সারের পচনহার এবং মাধ্যমিক যৌগ উৎপাদন নিম্নলিখিত উপাদানের উপর নির্ভর করে। 

সবুজ সার ব্যবহার করার মুখ্য উদ্দেশ্য হল জমিতে জৈব পদার্থ যোগ করা সবুজ সারের জন্য শিম্বীজাতীয় গাছ যখন ব্যবহার করা হয় তখন জমিতে কেবল নাইট্রোজেনই যোগ হয় না অন্যান্য খাদ্যোপাদান ফসফরাস, পটশিয়াম ও ক্যালসিয়ামেরও যোগ সাধন হয়। নিন্মে সবুজ সারজাতীয় শস্যের খাদ্যেপাদানের পরিমাণের একটি তালিকা উল্লেখ করা হল।

সবুজ সারজাতীয় শস্যের খাদ্যেপাদানের পরিমাণ

সবুজ সারজাতীয় শস্য

  নাইট্রোজেন

    ফসফেট

    পটাশ

    ক্যালসিয়াম   

শন 

  ০.৭৫% 

   ০.১২% 

   ০.৫১%  

     ০.৩৯%    

বরবটী 

  ০.৭১% 

   ০.১৫%  

   ০.৫৮% 

     ০.৬৪%    

মুগকলাই 

  ০.৭২% 

   ০.১৮% 

   ০.৫৩% 

     ০.৭৬%    

মাসকলাই 

  ০.৮৫%  

   ০.১৮%   

   ০.৫৩% 

     ০.৭৪%    

 

            
সবুজ সার ব্যবহারের ফলে গড়ে প্রতি একরে ৮০/১০০ পাঃ অর্থাৎ হেক্টরে ৯০-১১২.৫ কেজি নাইট্রোজেন যোগ হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে, যেমন-আলফাআলফা শস্যের সাহায্যে জমিতে প্রতি একরে ২০০ পাঃ অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে ২২৫ কেজি পর্যন্ত নাইট্রোজেন যোগ করা যেতে পারে।
সবুজ সার ব্যবহারের ফলে জমিতে কি পরিমাণ জৈব পদার্থের যোগ সাধন হয় তা প্রধানত এ উদ্দেশ্য ব্যবহৃত ফসলের বিভিন্নতার উপর নির্ভর করে। সাধারণত প্রতি হেক্টরে ৩ হতে ২৫ টন জৈব পদার্থ যোগ হয়। ভুট্টা অথবা সরগম খুব ভাল জন্মালে তা হতে প্রতি হেক্টরে সর্বাধিক ৬২৫ টন পর্যন্ত জৈব পদার্থ পাওয়া যেতে পারে। তাজা ও শুকনা জৈব পদার্থের অনুপাত ৬ : ১ অর্থাৎ ৬ টন তাজা জৈব পদার্থ ১ টন শুষ্ক জৈব পদার্থ পাওয়া যায়। কাজেই জমিতে ২৫ টন জৈব পদার্থ যোগ হলে অর্ধেক অর্থাৎ ১৮০০ কেজি হিউমাস যোগ হয়।
সবুজ সার তৈরী করার জন্য জমিতে যে শস্য জন্মানো হয় তাতে ফসফেট ও পটাশ সার প্রয়োগ করলে জমিতে কিছুটা বেশী পরিমাণে নাইট্রোজেন যোগ হয়। ফসফেট ও পটাশের প্রয়োগে গাছের শিকড়ে অধিক সংখ্যায় ও অধিক কার্যক্ষম গুটির সৃষ্টি হয়, তার ফলে গুটিতে অধিক মাত্রায় নাইট্রোজেন আহরিত ও সঞ্চিত হয়।



উপস্থিত অণুজীবের প্রকার: 
মাটিতে উপস্থিত অণুজীবের প্রকার ও কার্যপদ্ধতি যেমন ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের সংখ্যা, স্বভোজী ও অন্যভোজী অণুজীবের সংখ্যা, সবাত অণুজীবের সংখ্যা ইত্যাদি সবুজ পচন হার নির্ধারিত করে। 

উত্তাপ: 
সবুজ সারের পচনের জন্য ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সে. তাপ সবচেয়ে ভাল। কম বা বেশি তাপে পচন হার কমে। 

বায়ু চলাচল: মাটিতে বায়ু চলাচল পচন হার বাড়ায়। 

সবুজ সারের জন্য মনোনীত গাছের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সবুজ সারের মোট পরিমাণ এবং জমিতে পচনশীলতা বা পচন হারও ভিন্ন হয়। সবুজ গাছের বয়সভেদে এর রাসায়নিক গঠন ও উপাদানের পরিমাণে পার্থক্য হতে থাকে। এজন্য একটি নির্দিষ্ট বয়সের গাছ দিয়ে সার উৎপাদন করলে অধিক সুফল পাওয়া যায়। গাছের চারা বয়সে সহজে বিয়োজনযোগ্য নাইট্রোজেন পরিমাণে বেশি থাকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেলুলোজ ও লিগিনিনেন পরিমাণ বেড়ে গেলে গাছ পচতে অসুবিধা হয় বা বিলম্ব হয়। মাটির কার্বন ও নাইট্রোজেন অনুপাত বেড়ে যায়। গাছের বয়স বাড়ার সাথে পেন্টোসান দ্রব্যের পরিমাণও বেড়ে যায়। অবশ্য গাছের বয়স খুব কম হলে সেখানে পানি ও পানিতে দ্রবণীয় দ্রব্য বেশি থাকে বলে সবুজ সার হিসেবে এর স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা কম হয়। 

জমিতে সবুজ সার ব্যবহার করলে খুব উপকার পাওয়া যায়। যেমন : 
১. মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ে 
২. মাটির উৎপাদন বাড়ে 
৩. মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ে 
৪. মাটির ভৌত অবস্থার উন্নয়ন হয়, বিশেষ করে, মাটির সংযুক্তি উন্নয়ন সাধন 
৫. মাটির আচ্ছাদিত রেখে ক্ষয় কমে 
৬. মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ে 
৭. মাটিতে জীব ও অনুজীবের কার্যাবলী বাড়ে 
৮. ফসল উৎপাদনের রাসায়নিক সারের কার্যকারিতা বাড়ে 
৯. মাটি নরম রাখে। 

যেকোন ফসল বা লতাপাতা সবুজ অবস্থায় মাটিতে মিশিয়ে দিলে তা থেকে সবুজ সারের কিছু না কিছু উপকারিতা পাওয়া যায়। কিন্তু কতকগুলো বিশেষ গুণাবলীসম্পন্ন ফসল বা গাছ দিয়ে সবুজ সার করলে অনেক বেশি উপকার পাওয়া যায়। 

বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটির উর্বরতার বিবেচনায় নিম্নলিখিত উদ্ভিদসমূহকে সবুজ ফসল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যথা : ধৈঞ্চা, গো-মটর, শন, বরবটি, সিম, আলফালফা, ক্লোভার, লুসার্ন প্রভৃতি। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল কাউপি বা গো-মোটর দিয়ে সবুজ সার করার সম্ভবনা খুবই উজ্জ্বল। চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে বিপুল পরিমাণ জমিতে গো-মটরের চাষ হয়। 

যে সমস্ত জমি বেলেপ্রধান এবং জমিতে পানি জমার আশংকা নেই সেখানে সবুজ সার ফসল হিসেবে শন, পাট উপযোগী। এর শারীরিক বৃদ্ধ দ্রুত। মাটিতে এটি দ্রুত বিয়োজিত হয়। ধৈঞ্চা কিছুটা কষ্ট সহিষ্ণু উদ্ভিদ, এঁটেলজাতীয় মাটিতে ভাল জন্মে। ধৈঞ্চা কিছুটা খরা ও অপরদিকে জলবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। বাংলাদেশে জলাবদ্ধ জমিতে সবুজ ফসল হিসেবে তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী। 

সবুজ সারের প্রস্তুতি

আমাদের দেশে দুটি সুপরিচিত শস্য রয়েছে যা সবুজ সার তৈরীর জন্য ব্যবহার করা হয়। শস্য দুটি হচ্ছেঃ

(১) ধইঞ্চা ও

(২) শন।
নীচু জমিত ধইঞ্চা জন্মানো হয় আর মাঝরি হতে উঁচু জমিতে জন্মানো হয় শন। এর কারণ ধইঞ্চা পচার জন্য যথেষ্ট্য পরিমাণ পানির দরকার হয়। নীচু জমিতে পানির অভাব হয় না। শন পচিবার জন্য ধইঞ্চার মতো তত বেশী পানির প্রয়োজন হয় না। মাঝরি জমিতে যে পানি জমে তাতেই শন পচিয়া যায়।

 

ধইঞ্চা

একটি শিম্বীজাতীয় গাঢ় সবুজ রংয়ের গাছ। এ গাছে যথেষ্ট পাতা জন্মাতে দেখা যায়। এটি তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায় ও অল্প সময়ে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।
ধইঞ্চা জন্মাবার জন্য জমিতে তত চাষার দরকার হয় না, দুই একটি চাষ দিলেই চলে।  কোন রকম সার দিবার প্রয়োজন হয় না, তবে ফসফেট ও পটাশ হেক্টর প্রতি যথাক্রমে ১৭ ও ১১ কেজি হিসাবে প্রয়োগ করলে গাছের শিকড়ের গুটিতে অধিক পরিমাণ নাইট্রোজেন সঞ্চিত হয়। সার দুটির অধিকাংশ অংশ পরবর্তী ফসলেরও বিশেষ উপকারে আসে। হেক্টর প্রতি ৩৫-৪৭ কেজি হিসাবে বপন করিলে ধইঞ্চার চারা ঘন হয়ে  জন্মে যে তাতে আগাছা জন্মাবার মতো কোন ফাঁকা পায় না বা জন্মালেও তা গাছের নীচে চাপা পড়ে যায়। তাই বলার প্রয়োজন নেই যে ফসলটির চাষে কোন রকম বাড়তি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না । 
বপনের পর দুই হতে আড়াই মাসের মধ্যে গাছে ফুল ধরতে শুরু করে, তখনই বুঝতে হবে ফসল পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়ে সবুজ সার প্রস্তুতির জন্য উপযোগী হয়েছে। এ সময়ই লাঙ্গল দ্বারা চাষ করে গাছগুলি মাটির  নীচে ফেলতে হয়। গাছ বেশী লম্বা হয়ে পড়লে তা চাষের আগে কাস্তে বা হাসুয়া দ্বারা কেটে টুকরা টুকরা করে দিলে ভাল হয়, কারণ  লাঙ্গলে আটকিয়ে চাষের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। বর্ষা শুরু হলে মাটিতে অনেক পানি জমে। সে অবস্থায় ১০/১২ দিন পর পর ২/৩ টি চাষ দিলেই গাছ সম্পূর্ণরূপে পচে মটির সাথে মিশে যায় অর্থাৎ বলতে হয় ধইঞ্চার সবুজ সার প্রস্তুত করে জমিতে প্রয়োগ করা হল।
ধইঞ্চার সাহায্যে সবুজ সার প্রস্তুতের পর আমাদের দেশে প্রায় জমিতেই রোপা আমন ধান লাগান হয়। ইহা বেশ লাভজনক, তবে কোন কোন সময় তামাক ও গোল আলুর চাষও করা হয়।

 

শন

ইহাও শিম্বী-পর্যায়ভূক্ত উদ্ভিদ; মাঝারি উচ্চতা বিশিষ্ট ও ফিকে সবুজ রংয়ের একটি দ্রুতবর্ধনশীল শস্য। অল্প সময়েই গাছ পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং তাতে বড় বড় হলুদ রংয়ের ফুল ধরে।
ধইঞ্চার মতো করে জমি চাষ করলেই চলে অর্থাৎ গোটা দুয়েক চাষ দিলেই চলে। কোন রকম সার ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না, তবে হেক্টর প্রতি ১৭ কেজি ফসফেট ১১ কেজি পটাশ প্রয়োগ করিলে বর্তমান ও পরবর্তী ফসলের জন্য বেশ ভাল ফল পাওয়া যায়। তাই নিড়ানি দিয়ে ঘাস বা আগাছা পরিষ্কার করার কোন কথা উঠে না। মালচিং পানি সেচ ইত্যাদি অন্যন্য মধ্যবর্তী ফসল পরিচর্যারও কোন প্রয়োজন হয় না।
দুই হইতে আড়াই মাসের মধ্যে যখন গাছে ফুল ধরিতে থাকে তখন লাঙ্গল দিয়ে গাছগুলি মাটি চাপা দিতে হয়। পর পর কয়েকবার চাষ ও মই দিলে পানির সান্নিধ্যে গাছ মাসখানেকের মধ্যে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।
শনের সাহায্যে সবুজ সার করার পর যে যে ফসলের চাষ করা হয় সেগুলি হচ্ছে আখ, তামাক, আলু এবং বিলাতী সব্জী।